ঢাকাসোমবার , ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. আইন
  2. আবহাওয়া
  3. ইতিহাস
  4. ইসলাম
  5. ইসলামি আইনের শাসন
  6. ঐক্য
  7. খেলা
  8. খেলাফত
  9. জাতীয়
  10. ধর্মীয় খবর
  11. বিনোদন
  12. বিশ্ব
  13. মতামত
  14. মানবাধিকার
  15. মুসলিম উম্মাহ'র মুক্তি
আজকের সর্বশেষ খবর

শিশুদের আদর্শ জীবন গঠনে নববী ফরমান

dailymuktirsangram
ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

 

মহান রাব্বুল আলামীন এই জগত সংসারকে সচল রেখেছেন স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনের মধ্যে দিয়ে। এক সময় তাদের কোলকে আলোকিত করেই জন্মগ্রহণ করে একজন শিশু। সেই শিশুই আজকের কিশোর ও যুবক । সময়ের পালাপদলে এক সময় সে বার্ধক্যের দিকে নুয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবনকে এভাবেই সাজিয়েছেন।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন –

ثُمَّ نُخۡرِجُکُمۡ طِفۡلًا ثُمَّ لِتَبۡلُغُوۡۤا اَشُدَّکُمۡ ۚ وَمِنۡکُمۡ مَّنۡ یُّتَوَفّٰی وَمِنۡکُمۡ مَّنۡ یُّرَدُّ اِلٰۤی اَرۡذَلِ الۡعُمُرِ لِکَیۡلَا یَعۡلَمَ مِنۡۢ بَعۡدِ عِلۡمٍ شَیۡئًا ؕ
অর্থ: ‘তারপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি। তারপর (তোমাদেরকে প্রতিপালন করি) যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও। তোমাদের কতককে (আগেই) দুনিয়া থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং তোমাদের কতককে ফিরিয়ে দেওয়া হয় হীনতম বয়সে (অর্থাৎ চরম বার্ধক্যে), এমনকি তখন সে সব কিছু জানার পরও কিছুই জানে না’। – সূরা হজ্জ্ব – ৫

শিশুরা আল্লাহর অনন্য উপহার

শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার । আল্লাহর এক অনন্য নিদর্শন। একজন শিশুসন্তানের প্রতি মহাব্বত ও আকর্ষণ কেবল ঐ ব্যক্তিরই বোধগম্য হবে, যার সন্তানাদি রয়েছে। দীর্ঘদিনের সন্তানহীন একজন মায়ের গর্ভে একটি সন্তানের সঞ্চার হওয়া যেন মহান রবের একটি বিশেষ উপহার। তাইতো আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন –
وَّجَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَزۡوَاجِکُمۡ بَنِیۡنَ وَحَفَدَۃً

অর্থ : এবং তোমাদের স্ত্রীদের থেকে তোমাদের জন্য পুত্র ও পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন। —আন নাহ্‌ল – ৭২
আরো ইরশাদ করেন –
یَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّیَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّکُوۡرَ ۙ

অর্থ: যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে চান পুত্র সন্তান দান করেন। —আশ্‌-শূরা – ৪৯

নববী জবানে শিশুরা ফুল সাদৃশ্য

শিশুরা ফুলের মতন। দেখতেও বাস্তবে তেমন। যেন একটি ফুটন্ত গোলাপ।এমন এক মানব ফুলের দিকে একবার চাহনিতে যে কারোর জীবনের কষ্ট ম্লান হয়ে যাবে। ফিরে পাবে সে মনের গভীরে এক প্রশান্তি।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
عن عائشة، أن النبي صلى الله عليه وسلم أتي بصبي، فقبله، فقال: “أما إنهم مبخلة مجبنة، وإنهم لمن ريحان الله عز وجل”

হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এক শিশুকে আনা হলো। তিনি তাকে চুমু দিলেন। অতঃপর তিনি বললেন—
“নিশ্চয়ই শিশুরা (মানুষকে) কৃপণ করে দেয় এবং ভীতু করে দেয়; আর তারা তো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক একটি সুগন্ধি ফুল।” ( শরহুস সুন্নাহ: ৩৪৪৮)

এমন ফুলসাদৃশ্য শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কিছু নীতিমালা পেশ করেছেন । যার অবলম্বনে হতে পারে আজকের শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিনির্মাণ।
পাঠক, পাঠিকাদের বুঝার সুবিধার্থে বিষয়গুলিকে সুবিন্যস্ত ভাবে উল্লেখ করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

* শিশুদের সাথে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ

খেলাধুলা আর হাস্যরস শিশুদের এক স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। জীবনের প্রারম্ভে বিচিত্রময় খেলাধুলার মধ্য দিয়েই শিশুরা নিজেদের মৌলিক জীবনে প্রবেশ করে। এটা মহান রবের অবশ্যম্ভাবী বিধান। শিশুদের মেধা বিকাশের অন্যতম উপায় শৈশবের খেলাধুলা।
আমাদের অনেকে শিশুদেরকে খেলাধুলা থেকে আটকিয়ে রাখে। আবার কেউবা একেবারেই ছেড়ে দেয়। দু’টোই বাড়াবাড়ি আর ছাড়াছাড়ি। শিশুরা যেন অভদ্র পরিবেশে খেলাধুলা না করে এ ব্যাপারে মা-বাবার সচেতনতা একান্ত কাম্য‌। এই জন্য শিশুদেরকে কাজের ফাঁকে কিছু সময় দেয়া মা-বাবার কর্তব্য। এবং তাদের খেলাধুলা আর হাস্যরসের আয়োজনে নিজেকে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। ফলে, মা-বাবা আর শিশুর মাঝে এক আদর্শিক বন্ধন সৃষ্টি হয়। এবং শিশুদের বেড়ে ওঠার শিক্ষা মা-বাবার একান্ত সান্নিধ্য থেকেই অর্জিত হয়।
আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও শিশুদের সাথে অনেক সময় শিশুসুলভ আচরণ করতেন। মাঝে মাঝে তাদের সাথে খেলাও করতেন।
নিন্মে কয়েকটি হাদিস উদ্ধৃত হল,
১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জিহ্বা মুবারককে আদরের নাতি হাসান (রা.) এর দিকে (রসিকতা করে) মেলে ধরতেন। আর শিশু হাসান (রা.) জিহ্বা মুবারকের লালচে রং দেখে প্রফুল্লিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতেন। ( শরহুস সুন্নাহ: ৩৬০৩) (ইবনে হিব্বান: ৫৫৯৬)
২. হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি একবার হাসান- হুসাইন (রা.) কে নবীজীর কাঁধ মুবারকে উপবিষ্ট দেখে বললাম, তোমাদের ( আরোহনের) ঘোড়া কতই না সুন্দর! তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কতই না সুন্দর উভয় অশ্বারোহী! ( মসনদুল বাযযার: ২৯৩)
৩. আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন: একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (এক দৌড় প্রতিযোগিতায়) শিশু আবদুল্লাহ,ওবাইদুল্লাহসহ বনুল আব্বাসের আরো অনেক শিশুদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান। এরপর বললেন, এই প্রতিযোগিতায় যে সবাইকে সর্বাগ্রে ছাড়িয়ে যাবে , তাকে এমন এমন (বিশেষ) পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। (বর্ণনাকারী বলেন) তখন শিশুরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্যস্থল বানিয়ে দৌড় শুরু করে। ফলে কেউ নবীজীর পিঠ মুবারকে আর কেউ সীনা মুবারকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সহাস্য তাদেরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকতেন। ( মুসনদে আহমদ: ১৮৮৬)
৪. এক হাদিসে এসেছে, নবীপত্নী হযরত আয়শা (রা.) শৈশবে তার বাল্যসখীদের সাথে খেলা করতেন। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরস্পর খেলাধুলার জন্য তাদেরকে চুপিসারে আয়েশার দিকে এগিয়ে দিতেন ।( বুখারী: ৬১৩০)
৫. মাহমুদ ইবনে রবী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমার সেদিনের কথা এখনো স্মৃতিতে ভাসছে, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়িতে অবস্থিত একটি কুপের বালতি থেকে এক মুখ পানি আমার চেহারায় নিক্ষেপ করেন। ( বুখারী: ৮৪৯)
আমাদের নবী একজন মহামানব হয়েও শিশুদের সাথে মাঝে মাঝে এভাবে শিশুসুলভ আচরণ করতেন।
নববী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে যদি আমরাও শিশুদের সাথে মাঝে মাঝে এরূপ শিশুসুলভ আচরণ করি, তাহলেই এসব শিশুদের কোমল মনে বপন হবে সৌহার্দ্যতার বীজ। একসময় তা বৃক্ষরূপে শাখা মেলবে চারদিকে।

* শিশুদেরকে উপহার দেয়া এবং উদ্বুদ্ধ করা
শিশুরা স্বল্প কিছু উপহারে, সামান্য মধুর আচরণে প্রভাবিত হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি পরিক্ষিত। এই সময়টুতে শিশুরা আপনার হাতের মুঠোয়। যা বলবেন, তাই তারা মেনে নিতে সদা প্রস্তুত। পক্ষান্তরে আমরা শুধু শাসনের মধ্য দিয়ে শিশুদেরকে আপন করতে চাই, এটি মোটেও স্বীকৃত পদ্ধতি নয়।
আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে মাঝেমধ্যে কিছু উপহার দিতেন। আবার কখনো তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন। নিন্মে কিছু হাদিস উদ্ধৃত হল,
১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন সদ্য মৌসুমী ফল হাদিয়া আসতো, তিনি তখন নিন্মোক্ত দোয়াটি পড়তেন-
اللهم بارك لنا في مدينتنا وفي مدناوفي صاعنا.
অতঃপর, সম্মুখে উপস্থিত কোন এক শিশুকে ফলটি হাদিয়া দিতেন।( মুসলিম শরীফ: ১৩৭৩)
এভাবেই শিশুরা আত্মমর্যাদাবোধ শিখতে শুরু করে। যার ফলে তাদের মননে উন্নত চিন্তা বীজ বপন হয়। আর তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে শাখাপ্রশাখা মেলে।
উদ্বুদ্ধতা শিশুদের কর্মোদ্যমতাকে বাড়িয়ে তোলে। নতুন কিছু শিখতে ও করতে উৎসাহিত করে। জীবনের পথচলায় যা একান্ত আবশ্যক। শিশুদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে আমরা তাদেরকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হব, যদি আমরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করি।
বড় আফসোস! আমাদের অনেকে এসব বিষয়গুলোকে খুব মামুলি মনে করি। অথচ আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তা বাস্তবায়ন করে উম্মতদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।

* শিশুদের স্বভাব ও চরিত্র রক্ষায় সচেতন থাকা

শৈশবের স্মৃতিপটে যা খোদিত হয়, ভবিষ্যৎ জীবনে তাই উদগিরিত হয়। এটাই বাস্তবতা। শৈশবে শিশুরা যে কাজে অভ্যস্ত হয়; বড় হলে সেটি স্বভাবে পর্যবসিত হয়।
আমরা অনেকে শিশুদের টুকিটাকি চকোলেট আইসক্রিম বা সামান্য কিছু টাকার জন্য কারো কাছে হাত পাতাকে তেমন কিছুই মনে করি না। অথচ শৈশবের এই অভ্যাসটা তার বার্ধক্যের জীবনে হলেও কড়া নাড়তে পারে। এই বিষয়টি থেকে আমরা একেবারেই বেমালুম।
আমাদের নবীজী অন্যের কাছে সুয়াল বা ভিক্ষাবৃত্তি করা থেকে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন।
হাদিস শরিফে এসেছে,
দানের হাত চাওয়ার হাত থেকে অনেক বেশি উত্তম।(বুখারী :১৪২৭)
বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আমরা অনেকে শিশুদের হাতে স্ব-যত্নে মোবাইল নামক বীষধর সাপ তুলে দেই। নিজেদের অগোচরে নিষ্পাপ শিশুদের মুল্যবান জীবনকে আমরা বিষাক্ত করে দিচ্ছি। ফলে আমাদের স্বপ্নের শিশুটি একসময় আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় ।
তাই এখুনি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পরিবারের কর্ণধারদেরকে আরো সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।

* শিশুদের সাথে উপহাস নয়, সর্বদা সহাস্য কথা বলাই কাম্য

আমাদের সমাজে এমনও লোক আছে শিশুদের দেখলে যাদের আর তর সয়না। তাদের সাথে রুক্ষ আচরণ করাই যেন তার নীতিগত বৈশিষ্ট্য (?)
অথচ আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে কত সদয় আচরণ করতেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এক হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আমার এক ভাইয়ের নাম ছিল উমায়ের। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথিমধ্যে যখনি তাকে দেখতেন বলতেন- হে আবু উমায়ের! তোমার নুগায়ের ( এক প্রকারের ছোট্ট পাখি যা দিয়ে উমায়ের খেলা করত) কেমন আছে? ( বুখারী: ৬২০৩)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে যখন সেজদাবোনত হতেন, তখন হাসান হুসাইন (রা.) এসে নবীজীর কাঁধ মুবারকে বসে পড়তেন। লোকেরা নিষেধ করতে চাইলে, নবীজী ইশারা করে তাদেরকে বারণ করতেন। (বুখারী: ২৭০৪)
উক্ত হাদীসদ্বয় দ্বারা বুঝা যায়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী পরিমাণ সদাচারি ছিলেন শিশুদের প্রতি এবং কত ধর্য্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

অতএব আসুন! শিশুদেরকে অবজ্ঞা না করে সমাদর করি, একটু তাদের সাথে সহাস্য কথা বলি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তৌফিক দান করুন। আমীন!

* শিশুদেরকে ভালো কাজের জন্য বাহবা প্রদান করা

শিশুরা মাঝেমধ্যে শিশুসুলভ খুঁটিনাটি কাজ করে থাকে অথচ এর কোন গুণগ্রাহী থাকে না। আমরা যদি এর প্রশংসা করি শিশুদের শিশুমন তখন আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। এসব শিশুরা তখন কর্মে উদ্যমশীল হয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে থাকবে।
আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে বাহবা প্রদান করতেন। কাওকে সত্য বলার জন্যে আবার কাউকে অন্য কোন কারণে।
এক হাদীসে এসেছে,
শিশু সাহাবী হযরত উমায়ের ইবনে সাঈদ ( রা.) এর কথার সত্যতায় যখন কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হল। আর সেই কথাটি ছিল, রসূলের কটুক্তিকারীর বিরুদ্ধে সত্য এবং সঠিক কথা বলা। এরপর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমায়েরের কান মৃদুভাবে ধরে তাকে সত্য বলার কারণে অভিবাদন জানাতে থাকেন এবং বললেন-
হে উমায়ের! … এবং তোমার রব তোমাকে সত্যায়িত করেছেন।( আত তাবাকাতুল কুবরা: ৫৪০৬)
রসূলের জবানের অভিবাদন শিশু উমায়ের কচি মনে কেমন প্রভাব বিস্তার করেছে তা কী আর বলার অপেক্ষা রাখে!

অনুরূপ শিশুদেরকে যদি কোন ভালো কাজের জন্য আমরা অভিবাদন জানাই, তাহলে ঐ কাজটির প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ অনেক বেড়ে যাবে। এভাবে উদ্বুদ্ধ ও বাহবার মধ্য দিয়ে শিশুরা এক আলোকিত জীবনে প্রবেশ করবে।

* শিশুদের প্রতি সর্বাবস্থায় দয়াশীল হওয়া

শিশুদের ছোটখাটো ভুলত্রুটিকে ক্ষমার
দৃষ্টিতে দেখে তাদের প্রতি দয়াশীল হওয়া একান্ত কাম্য। এমনিতেই আল্লাহ তায়ালা শিশুদের মধ্যে মায়া মুহাব্বাত ঢেলে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে মুহাব্বতকে উপেক্ষা করে তাদের প্রতি অবিচার করা নিতান্ত অন্যায় ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে শিশুদের কান্না শুনলে নামাজকে অনেক সংক্ষিপ্ত করতেন।
এক হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আমি যখন দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে দাড়াই আর শিশুদের কান্নার আওয়াজ শুনি; তখন মায়েদের কষ্ট হওয়ার ভয়ে আমি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে পড়ি।( বুখারী: ৬৭৫ )
নামাজ অবস্থাও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি কীরূপ খেয়াল রাখতেন তা উক্ত হাদীস দ্বারাই প্রতীয়মান হয়।

* শিশুদেরকে সালাম দেয়া

সালাম হল ইসলামের অভিবাদন পদ্ধতি। এর মাধ্যমে একজন আরেকজনের কাছে শান্তি ও সৌহার্দ্যের বার্তা পৌঁছায়। ছোট হোক বড় হোক শান্তির পয়গাম পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। তাই ইসলামের বিধান হল, ছোট যেমন বড়কে সালাম জানাবেন, অনুরূপ বড়ও ছোটকে সালাম জানাবে।
অথচ ছোটদেরকে সালাম দেয়ার রীতি আমাদের মাঝ থেকে একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেকে বিষয়টি একেবারেই মেনে নিতে পারেন না। তাই তাদেরকে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিস স্বরণ করিয়ে দিচ্ছি।
হযরত জাবের ইবনে ছামুরা ( রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবীজীর সাথে প্রথম নামাজ আদায় করলাম। অতঃপর নামাজ শেষে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। আমিও তার সাথে বেরিয়ে পড়ি। পথিমধ্যে মদিনার শিশুরা নবীজীকে ঘিরে অভিনন্দন জানাতে থাকে। তখন নবীজী এক এক করে তাদের প্রত্যেকের গণ্ডদেশে স্নেহঃবশত হাত বুলাতে থাকেন। এবং আমার গণ্ডদেশেও নবীজী হাত বুলিয়েছেন। আমি তখন নবীজীর হাত থেকে এমন শীতলতা ও সুগন্ধি অনুভব করেছি, মনে হল সে হাতখানা তিনি সুগন্ধি বিক্রেতার ঝুলি থেকে বের করেছেন।( মুসলিম: ২৩২৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তখন তাদেরকে সালাম জানাতেন।(মুসলিম: ২১৬৮)
এটি সওয়াবের বিষয়তো বটেই, তাছাড়া যদি আমরা শিশুদেরকে সালাম দেই তাহলে তারা শৈশব থেকেই ইসলামী পরিবেশে বেড়ে উঠবে।

* শিশুদের জন্য দোয়া করা

শিশুদের মাথায় স্নেহের পরশে হাত বুলিয়ে দেয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের জন্য দোয়া করতেন।
১. হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন শিশুদেরকে আনা হতো, তখন তাদের জন্য তিনি বরকতের দোয়া করতেন এবং তাহনিক করতেন।( মুসলিম: ২১৪৭)

২. হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য দোয়া করলেন ও বললেন,আয় আল্লাহ! আপনি তার ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি করে দিন। এবং তাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দান করুন। (বুখারি: ১৯৮২)
অতএব আমাদের উচিত, শিশুদের জন্য দোয়া করা। তাদের জীবনের উন্নতির জন্য আল্লাহর দরবারে দু হাত তুলে মোনাজাত করা।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দান করুক। আমীন!

সর্বশেষ কথা হল,
শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য আমানত। তাই এই আমানতের সংরক্ষণ আমাদের জন্য অতীব জরুরী। কথিত আছে, আজকে শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই, আমাদের শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে পূর্বোক্ত নববী নির্দেশনার বিকল্প নেই । আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন!

মুফতি জুনায়েদ কাসেমী
মুহাদ্দিস: জামিয়া ইসলামিয়া আযিযিয়া ওয়াসেকপুর, সোনাইমুড়ী নোয়াখালী ।

Visited ২৪ times, ১ visit(s) today

এই ওয়েবসাইটের সকল কোনো লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিও “dailymuktirsangram” কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কপি করা দন্ডনীয়। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করলে কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।